ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বর্তমান সরকার ব্যবস্থাকে উৎখাত করাকে ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে সামরিক সক্ষমতা থাকলেও দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো কার্যকর কোনো কৌশল ইসরাইলের নেই বলেই মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করা কার্যত অসম্ভব বলে তারা মনে করেন। এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী স্থল অভিযান, যার জন্য ইসরাইলকে বিশাল সামরিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সক্ষমতা রাখতে হবে। কিন্তু এসব সক্ষমতা ব্যবহার করলে সেগুলোও প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে। সামরিক সাফল্যই সরকার পতনের নিশ্চয়তা নয়।
নিজ দেশের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে যখন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর সমর্থন নিম্নমুখী, ঠিক তখনই তিনি এমন কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান পিট হেগসেথের ইসরাইল সফরের পরপরই তিনি এ ঘোষণা দেন। যদিও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। সিএনএন কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানায়। গাজায় গণহত্যার অভিযোগ ও সামরিক অভিযানের কারণে দেশটি আগে থেকেই ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইতিমধ্যে দুই দফা বড় ধরনের হামলা মোকাবিলা করেছে এবং দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা এখনো অটুট রয়েছে। সংঘাত নতুন করে বিস্তৃত হলে ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইরানকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার মতো বিশ্বাসযোগ্য পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন, যার ফলে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাদের মতে, তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক স্বার্থে পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটানো এড়িয়ে চলতে পারে তেহরান।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহামের মতে, ইসরাইলের আকাশপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা থাকলেও সেটি সরকার উৎখাতের জন্য যথেষ্ট নয়। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় থেকেই নেতানিয়াহু ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। সেই সময় থেকেই তার অভিযোগ ছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা কঠোর স্বৈরশাসন ও উগ্র মতাদর্শের মিশেলে তৈরি।
তবে তিন দশক পর, ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির অভিযানে মার্কিন হস্তক্ষেপের পরেও ইরানের সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। তুরস্কের কায়সেরি শহরের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাগলার কুরচ জানান, বিমান হামলা দিয়ে সামরিক শক্তি কিছুটা দুর্বল করা গেলেও ইরানের সুরক্ষিত বা গোপন স্থানে রাখা অস্ত্র ও সরঞ্জাম ধ্বংস করা কঠিন। কার্যকর ফল পেতে হলে স্থলসেনা মোতায়েন ও বছরের পর বছর সেখানে অবস্থান করার সক্ষমতা প্রয়োজন, যা ইসরাইলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গোয়েন্দা ও সাইবার সক্ষমতার বিষয়ে কনিংহাম উল্লেখ করেন, ইসরাইলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গোপন নেটওয়ার্ক কাজে লাগালে সেগুলোর পরিচয় ফাঁস হতে পারে, যা পরবর্তীকালে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ভেঙে দিতে সক্ষম। কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দিয়েও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাঙার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, কারণ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। কনিংহাম বলেন, আগের পাল্টাপাল্টি হামলায় ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রের মজুত কমেছে।
আর্থিক ও সামরিক দিক থেকে সংঘাতের দীর্ঘসূত্রতা ইসরাইলের ওপর বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করতে পারে।
কনিংহাম জানান, ইরানের সস্তা ড্রোনের তুলনায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম অনেক বেশি, যা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের হাতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্য থাকতে পারে। পুরোনো চীনা প্রযুক্তির জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে ইরান।
অন্যদিকে, ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা জিবিইউ-৫৭ বাংকার ধ্বংসকারী বোমার প্রয়োজন, যার প্রতিটি ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের।
২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান ফোরদো ও নাতাঞ্জের পারমাণবিক স্থাপনায় এগুলো ব্যবহার করেছিল।
এই ধরনের ভারী অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা ইসরাইলের এককভাবে নেই।
সর্বশেষ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে নতুন হামলার বিষয়ে ইসরাইলের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া ইরানের গভীরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো ইসরাইলের জন্য দুঃসাধ্য। এ অবস্থায় কোনো একক পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইরান পাল্টা আক্রমণের মূল লক্ষ্য হিসেবে ইসরাইলকেই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানকে সবচেয়ে বিপজ্জনক শাসনব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে সেই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি। তাই অভিযানে কতটা বাস্তব সামরিক সাফল্য পাওয়া যাবে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।



