চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। চীনের কাছে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এ ধরনের এক প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ। চীন বিষয়ে ট্রাম্পের নীতি এবং তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ফক্স নিউজ সানডে’কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান। পারডিউ উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই বলে থাকেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে নিয়মিত অস্ত্র বিক্রি করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি’কে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহী কি না। তবে ট্রাম্প ঠিক কোন সময়ে এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন, কী ধরনের অস্ত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কিংবা প্রেসিডেন্ট শি এর বিপরীতে কী জবাব দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে রাষ্ট্রদূত পারডিউ বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।
আইনি জটিলতা ও দুই নেতার বৈঠক
এ বছর মার্কিন ও চীনা দুই নেতার মধ্যে দুবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মে মাসে বেইজিংয়ে তাদের প্রথম বৈঠকের পর গত সপ্তাহে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট শি। তবে বাস্তবে চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি করা আইনত অত্যন্ত জটিল। ১৯৯০ সালে মার্কিন কংগ্রেস চীনের মূল ভূখণ্ডের জন্য ইউএস মিউনিশনস লিস্টে থাকা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের জাতীয় স্বার্থসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সুযোগ রয়েছে, তবুও কয়েক দশক ধরে এই বিধিনিষেধ বেইজিংয়ের ওপর মার্কিন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।
তাইওয়ান ইস্যু ও সামরিক সহায়তা
এক চীন নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে চললেও তাইওয়ানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো অব্যাহত। ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী, তাইওয়ানকে তাদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সেবা দিতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিং বারবার ওয়াশিংটনের এই সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। চীনের মতে, এসব অস্ত্র বিক্রি তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এবং তাইওয়ান প্রণালিতে সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করে তোলে। শি’র ওয়াশিংটন সফরের আগে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছিল। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য এ যাবৎকালের বৃহত্তম ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করে। এছাড়া প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে ঝুলে রয়েছে, যেটিকে ট্রাম্প ভালো দর-কষাকষির মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। দুই নেতার বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত নথিতে আটকে থাকা ওই প্যাকেজ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এটি ছিল এ পর্যন্ত ঘোষিত সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিষয়ক প্যাকেজ।
উৎপাদন সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান
তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত পারডিউ দাবি করেন, পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্প ইতিমধ্যে তাইওয়ানের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি অস্ত্র অনুমোদন করেছেন। তার মতে, শি’কে ট্রাম্পের সেই প্রশ্নটিকে কোনো আনুষ্ঠানিক অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব হিসেবে না দেখে বরং প্রেসিডেন্টের চুক্তি ও দর-কষাকষিনির্ভর রাজনৈতিক পদ্ধতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা উচিত। তবে বাস্তবে ওয়াশিংটন এমন কী অস্ত্র বেইজিংকে সরবরাহ করতে পারে, যা চীন নিজেরা তৈরি করে না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। চীন বর্তমানে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রচলিত অস্ত্রের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও ডলারের হিসাবে অনেক তালিকায় চীনের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নিচে দেখানো হয়, কিন্তু তা মূলত বিক্রির আয়ের ওপর ভিত্তি করে করা। জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় ২৩০ গুণ বেশি বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ড্রোন উৎপাদনেও চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ১০০ গুণ এগিয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করে, ফলে নিজের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে তা ভাগ করে নেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ ছাড়া কংগ্রেসের শুনানিতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোট আকারের ড্রোন উৎপাদনে চীনের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ১০০ গুণেরও বেশি।



