গভীর সংকটে সিটি গ্রুপ: ঋণের পাহাড় ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগে দেউলিয়ার পথে শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী

, ব্যাংক

গভীর সংকটে সিটি গ্রুপ: ঋণের পাহাড় ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগে দেউলিয়ার পথে শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী

বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য খাতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় একটি ছোট সরিষার তেলের মিল দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে। তবে ২০২৪ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে গ্রুপটির ওপর ঋণের বিশাল বোঝা এবং বিভিন্ন খাতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগের ফলে সৃষ্ট আর্থিক সংকট তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকেরা। এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে হাজার কোটি টাকার তহবিল বের করে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে এবং প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখতে গ্রুপটি তাদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো থেকে নতুন করে সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রুপটি তারল্য সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, গত মার্চ মাস পর্যন্ত সিটি গ্রুপের দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এইচএসবিসি’র পাওনা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক পিএলসি’র ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ৯৮৬ কোটি টাকা।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ১০৮.৫৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্রুপটির ছয়টি শিল্প প্রকল্প রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বর্তমানে অলস পড়ে আছে। এই বিনিয়োগের বিপরীতে ক্রমাগত সুদ ও অর্থায়নের খরচ জমা হচ্ছে। সিটি গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এছাড়া ২০২২ সালে বিনিময় হারের বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণেও তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

সংকট কাটাতে এবং ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রুপটি তাদের মালিকানাধীন ১৮ হাজার ৮৭৫ একর আয়তনের আটটি চা বাগানের আংশিক বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিক্রির বিষয়েও আলোচনা চলছে। ২০২৩ সালে গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মারা যাওয়ার পর বর্তমানে তার ছেলে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। এদিকে, বিদেশে টাকা পাচারের গুঞ্জন ও অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কোনো বড় শিল্পগ্রুপের খেলাপি হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। তিনি জানান, আইন মেনে নীতিগত সহায়তা প্রদানের সুযোগ থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা করার চেষ্টা করবে। তবে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায় করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এছাড়া প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভঙ্গুর ঋণ কাঠামোর মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে চাটুকারিতার সেই সাম্রাজ্যে এখন ধস নেমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে আগের নেয়া খেলাপি ঋণ ও সুদের পাহাড় সিটি গ্রুপকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: এর ফলে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে, অথচ এর বিপরীতে অর্থায়নের খরচ বা সুদ ক্রমাগত জমা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যখন কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তার পরিণতি এমনই হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যদি কোনো নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন হয় এবং তা আইনের মধ্যে থেকে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলো কতোটুকু ঋণ আদায় করতে পারবে তা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা চার-পাঁচটি ব্যাংক মিলে কাউকে উদ্ধার (সালভেজ) করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভোজ্য তেল, আটা-ময়দা, চিনি, ডাল, চাল, ফিডসহ অন্যান্য ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের ব্যবসা রয়েছে।