বরফ যুগের মানুষের খাদ্যভ্যাস ও জীবনযাত্রার ওপর করা সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিস্ময়কর তথ্য সামনে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দাঁতের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, মানুষ আজ থেকে অন্তত ২৫ হাজার বছর আগেও নিয়মিত সুপারি সেবন করত। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। যত বেশি তাঁরা সুপারি চিবিয়েছেন, দাঁতের ক্ষতিও তত বেড়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে দক্ষিণ সুলাওয়েসিতে দুজন শিকারি-সংগ্রাহক মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়। এদের মধ্যে একজনের সময়কাল ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছর আগের এবং অন্যজনের ৭ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ বছর আগের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও এই দুই ব্যক্তির মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ১০ হাজার বছর, তবুও তাদের দাঁতের গঠনে অদ্ভুত এক মিল লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা।
তাদের দাঁতের উপরিভাগে গভীর ও গোলাকার ক্ষয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দাঁতের ক্ষেত্রে বিরল। গবেষকদের মতে, ওই মানুষেরা শক্ত কোনো গোলাকার বস্তু দীর্ঘ সময় দাঁতের মধ্যে রেখে চিবাতেন, যার ফলে ঘর্ষণে গভীর খাঁজ তৈরি হয়েছে। সুপারির শক্ত বীজের আকার ও গঠন এই ক্ষয়ের চিহ্নের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এমনকি এক ব্যক্তির দাঁত এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল যে, ভেতরের পাল্প চেম্বার উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল, যা তীব্র যন্ত্রণার ইঙ্গিত দেয়। এতে সম্ভবত তাঁর তীব্র ব্যথাও হয়েছিল।
আধুনিককালে সুপারি সাধারণত চুনের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হয়, যাতে এর সক্রিয় উপাদান শরীরে দ্রুত শোষিত হতে পারে। কিন্তু প্রাচীনকালে চুন ছাড়া সুপারি চিবানোর কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য গবেষকেরা কৃত্রিম লালার সহায়তায় একটি পরীক্ষা চালান। তারা দেখেন, দীর্ঘ সময় চিবানোর ফলে সুপারি থেকে ‘অ্যারেকোলিন’ নামের উপাদান নির্গত হয়, যা মানুষের মস্তিষ্কের রিসেপ্টরে প্রভাব ফেলে। দাঁতের জৈব-আণবিক বিশ্লেষণেও অ্যারেকোলিনের উপস্থিতি মেলায় প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীন মানুষেরা নেশার আমেজ পেতেই নিয়মিত সুপারি চিবাতেন। পরে সেই তরল এমন ব্যাঙের ডিমের কোষে প্রয়োগ করেন, যেগুলোকে মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রিসেপ্টর তৈরি করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু সুপারি চোষার মাধ্যমেও এর সক্রিয় উপাদান শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শুধু পান–সুপারিও কি জর্দা ও তামাক পাতার মতো ক্ষতিকর।
গবেষকদের ধারণা, নেশার পাশাপাশি দাঁতের ব্যথা কমানোর জন্যও সুপারি ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ অ্যারেকোলিনের ব্যথা নিরসনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, সুপারি চিবানোর অভ্যাস একদিকে ব্যথা কমাত, অন্যদিকে দাঁতের ক্ষয় বাড়িয়ে দিত। এর ফলে দাঁতের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তারা সুপারি চিবানোর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। দাঁতের এই ক্ষয় কীভাবে হলো, তা জানতে গবেষকেরা বিভিন্ন সম্ভাবনা বিবেচনা করেন। আবার সুপারির কারণে ব্যথা কিছুটা কমে যাওয়ায় দাঁতের সমস্যা বাড়তে থাকলেও অভ্যাসটি তাঁরা চালিয়ে যেতে পেরেছেন, এমন সম্ভাবনাও আছে।
নেশাজাতীয় উদ্ভিদের ব্যবহারের ইতিহাস সাধারণত কৃষিকাজের সূচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বছর আগে কৃষির বিকাশের সময় বার্লি থেকে বিয়ার তৈরির নজির পাওয়া যায়। কিন্তু সুলাওয়েসির এই গবেষণা প্রমাণ করল যে, কৃষি বিপ্লবের অনেক আগেই, অন্তত ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর আগে থেকে মানুষ নেশাদ্রব্য হিসেবে সুপারি ব্যবহার করে আসছিল।
এই আবিষ্কার স্পষ্ট করে যে, উদ্ভিদজাত নেশাদ্রব্য ব্যবহারের প্রবণতা কোনো আধুনিক বিষয় নয়, বরং এর শেকড় মানব ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রোথিত। হাজার বছর আগের মানুষেরাও এই অভ্যাসের কারণে শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সেই সুদূর অতীত থেকেই নেশা ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে মানুষের জীবনযাত্রায় মিশে ছিল।



