সৌদি-আমিরাত সম্পর্ক: বরফ গলে ফের কাছাকাছি দুই উপসাগরীয় শক্তি

, বিশ্ব

সৌদি-আমিরাত সম্পর্ক: বরফ গলে ফের কাছাকাছি দুই উপসাগরীয় শক্তি

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে আবারও ঘনিষ্ঠতা তৈরির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা এমন ইঙ্গিতই বহন করছে। দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্বের জায়গা থেকে রিয়াদ ও আবুধাবি ফের এক কাতারে আসার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু তৎপরতায় তেমন ইঙ্গিতই মিলছে। উপসাগরীয় কূটনীতির আওতায় দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সফর বিনিময় একটি নিয়মিত বিষয়।

গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী মনসুর বিন জায়েদ সৌদি আরবে এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে যান। সেখানে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি এবং ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। আমিরাতের জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ন্যাশনাল’ এই সফরকে দুই দেশের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণে এই বৈঠক বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের ঠিক পরদিন সৌদি আরবে মনসুর বিন জায়েদের এই উপস্থিতি নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। যদিও সরকারিভাবে একে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ বলা হয়েছে, তবে ইসরাইলি গণমাধ্যমের দাবি, ওই বৈঠকে অন্যান্য আরব দেশের কর্মকর্তারাও ছিলেন। সেখানে ইরান ও হুথিদের মতো অভিন্ন হুমকির বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে সৌদি আরবে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ইরান।

ইয়েমেন ইস্যু মূলত দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্যকে সামনে এনেছিল। এক সময় সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল ইয়েমেন সংকট। ইরান-সমর্থিত হুথিদের দমাতে একযোগে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে। সৌদি আরব ইয়েমেনের সরকারকে অটুট রাখতে চাইলেও আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি)’ প্রাধান্য দেয়। হোদেইদাহ বন্দর এলাকা নিরাপদ মনে হওয়ার পর আমিরাত যুদ্ধ থেকে সরে এলেও রিয়াদ পুরো হুথিমুক্ত ইয়েমেন চেয়েছিল।

পাশাপাশি সুদান, ইরান নীতি এবং ওপেক (OPEC) থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে দূরত্ব বাড়ে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে রিয়াদ এখন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। চলতি বছরের শুরুতে বহুজাতিক সামুদ্রিক জোট গঠন এবং পরে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে ‘মক্কা চুক্তি’ করলেও কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা মেলেনি। এমনকি ইয়েমেন থেকে ২০২২ সালে কোনোরকমে নিস্তার পাওয়া সৌদি আরব এখন পুনরায় সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি এড়াতে চায়। এ কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন ‘অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক)’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল আমিরাত। তবে বর্তমানে হুথির হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে ইসরাইলের পরিবর্তে পাকিস্তান ও পুরোনো শত্রু তুরস্কের দিকে ঝুঁকেছে রিয়াদ।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত বুধবার শুরা কাউন্সিলের ভাষণে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা অবিচ্ছেদ্য এবং ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে মিলে কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে তারা নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করছেন। মূলত ইরান ও হুথিদের মোকাবিলায় একক কোনো দেশের চেয়ে জিসিসির সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বেশি কার্যকর হবে বলে দুই দেশই মনে করছে।

ইতিবাচক সম্পর্কের আরেকটি ইঙ্গিত মিলেছে চলতি বছরের বিভিন্ন কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে। জুলাই মাসে সৌদি ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ দুই দেশের ঐতিহাসিক ও অটুট বন্ধনের কথা উল্লেখ করেন। এরপর আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বাদশাহ সালমানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এটি পারস্পরিক আস্থার এক নতুন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চীনকেও এক্ষেত্রে একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে দেখছে রিয়াদ। চীনের মাধ্যমে ইরানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে সম্মত হলেও সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় রিয়াদ ও আবুধাবি তাদের পুরনো কৌশলগত অংশীদারত্বের জায়গাটিতে ফিরে আসতে চাইছে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আমিরাত অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও, সৌদি আরব এ বিষয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে। তবে এখন তারা তুরস্কের মতো পুরনো প্রতিপক্ষের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং আঞ্চলিক সংহতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের রাজনৈতিক মেন্টর হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে পুনরায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখাকে সৌদি যুবরাজ কৌশলগতভাবে জরুরি বলে মনে করছেন। দৃশ্যত মনে হচ্ছিল তারা যেন চিরকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসি গঠিত হয়েছিল ইরানকে কেন্দ্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরির লক্ষ্যে। আজকের পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ইরান ও তার প্রক্সিদের মোকাবিলায় রিয়াদ ও আবুধাবি সেই পুরনো ঐক্যকেই নতুনরূপে সাজাতে চাইছে। তাদের মূল লক্ষ্য এখন সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার সমন্বয়ে নিজেদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের লক্ষ্যে উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়ই যাতায়াত করে থাকেন।’।

পরিশেষে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয়েই উপলব্ধি করছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের বিচ্ছিন্ন অবস্থান কেবল ইরান ও হুথিদের মতো গোষ্ঠীর শক্তি বৃদ্ধি করবে। তাই বিদ্যমান দ্বন্দ ও ভিন্নমত ভুলে তারা পুনরায় অভিন্ন স্বার্থে এক হওয়ার পথেই হাঁটছে। এ অগ্রযাত্রা উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।