আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের কশাঘাতে অল্প বয়সে বিয়ের শিকার শিশুরা

, বিশ্ব

আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের কশাঘাতে অল্প বয়সে বিয়ের শিকার শিশুরা

আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশে তীব্র খরা ও ফসলহানির কারণে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পেরে অনেক পরিবার তাদের মেয়েশিশুদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সী দারেল্লা, যে বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির স্ত্রী, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানায়, ‘আমি এখনো শিশু। এই বয়সে বিয়ে করা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাবার বাড়িতে ফিরে আসা এই কিশোরী জানায়, তাদের পরিবার মূলত ঋণের বোঝা কমাতেই তাকে এই পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। মেয়েটি বিয়ের পর ১৫ ঘণ্টার দূরত্বে চলে গেলে তাকে আর দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার মা। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরই তাদের সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়।

এ অঞ্চলের ৯৫ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ফসল ও চারণভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ শহরমুখী হচ্ছে, কিন্তু সেখানেও অভাব কাটছে না। ১১ বছর বয়সী খাতিরাকেও ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তার মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকেই মেয়েটি চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছে, বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং সম্ভাব্য পাত্র সামনে এলে লুকিয়ে পড়ছে। খাতিরা নিজেও বলছে যে এই সম্পর্কে সে বিন্দুমাত্র খুশি নয়। বাদঘিসের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন।

পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব এতোটাই প্রকট যে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তারা মানবেতর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সী নাজিলার হবু স্বামীর বয়স ১৫ বছর। অন্যদিকে, আট বছরের ছেলের ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা খরচ জোগাতে ব্যর্থ হয়ে বাবা-মা দুই বছরের শিশু ফাতেমাহকেও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলের একটি কিডনি বিক্রি করে খাবার জোগাড় করার মতো ঘটনাও সেখানে ঘটছে। খোশকিয়ান গ্রামের আবদুল আজিজ জানান, ঋণ শোধ করতে তিনি তার পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তার মেয়ে মাজরি মাত্র ১২ বা ১৩ বছর বয়সে সংসার শুরু করে, এখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সেই সে দুই সন্তানের মা।

ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তানবিষয়ক কর্মকর্তা মার্ক ক্যালডার সতর্ক করে বলেছেন, বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অথচ দেশটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়ার মতো ক্লিনিকগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আয়েশা নামের ১২ বছর বয়সী আরেক কিশোরীর মা সারা জানান, তার স্বামী ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মেয়েকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের টাকা পাওয়ার পরও পরিবারের অবস্থার উন্নতি হয়নি; বরং দুই মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া থাকায় তাদের উচ্ছেদের মুখে পড়তে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটিতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। কাজ না পেয়ে অনেকেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। পুরো অর্থ দেয়া হলে পাত্রপক্ষ মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায়।

সারার অসহায়ত্ব এই যে, মেয়ের সামনে তিনি বিয়ের কথা তুললেই আয়েশা কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতির চাপে পড়েও তিনি মেয়েকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছেন, যাতে তার শৈশবের সামান্য সময়টুকু অন্তত অটুট থাকে। বাল্যবিবাহের এই ট্র্যাজেডি আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির একটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে, যেখানে কেবল দারিদ্র্য মুক্তির আশায় শিশুদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিতে হচ্ছে।