ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে ১৫ বছরের চুক্তি

, বাংলাদেশ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে ১৫ বছরের চুক্তি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেল সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে বাংলাদেশ সরকার ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে এ বিষয়ে ১৫ বছর মেয়াদি একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে তাদের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী জানান, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এনসিটিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশই এই এনসিটি দিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কন্টেইনার খালাস, জাহাজের অবস্থানকাল এবং যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এখনো বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার মানোন্নয়নে ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব অর্থায়নে বিনিয়োগ করবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপনে কোম্পানিটি ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধনী বিনিয়োগ করবে।

চুক্তি সইয়ের সময় ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে বামপন্থি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাধার মুখে পড়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর গাড়ি। এই বিক্ষোভ চলাকালে সিপিবি ও বাসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ অনেকে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তারক্ষীদের কড়া বেষ্টনীতে মূল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

আর্থিক লাভজনকতার বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি হিসেবে পাবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনাল পরিচালনার কার্যক্রম শুরুর আগে ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিশোধ করবে। এছাড়া প্রতিটি ২০ ফুট কন্টেইনার পরিবহনের বিপরীতে রাজস্বের প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সরকারের দাবি, এই পিপিপি মডেলে কোনো ঋণ নিতে হচ্ছে না, যা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সাথে তুলনার সুযোগ রাখে না। বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশটির এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে আরও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ তৈরি হবে। আমাদের পরিচালনাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেবা দেয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে চাই। একইসঙ্গে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।

চুক্তি অনুযায়ী টার্মিনালের মালিকানা, মূল অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকছে। এমনকি নিরাপত্তা, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত সার্বভৌম কর্তৃত্ব বাংলাদেশের হাতেই থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পরিচালনায় থাকা চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড বিদেশি অপারেটরের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনাল পরিচালনা করবে।

অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কাজের মান তদারকির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকছে। চুক্তিতে বিভিন্ন মূল কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই) নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি টানা তিন মাস ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বা ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো সূচকগুলোতে ডিপি ওয়ার্ল্ড লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের আর্থিক জরিমানা দিতে হবে। এছাড়া জনবলের বিষয়ে বলা হয়েছে, টার্মিনালে বর্তমানে কর্মরত স্থানীয় জনবলকে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন পরিচালন কাঠামোয় ধারাবাহিকভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। আমাদের বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে স্থিতিশীলতা আনা।

এদিকে, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধি দলের প্রধান ঈসা কাজিম পরবর্তী সময়ে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ফ্রি ট্রেড জোন ও রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো স্থাপনের মতো নতুন খাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিশ্বব্যাপী ডিপি ওয়ার্ল্ড ৪০টিরও বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বিশ্বের মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের এই বৈশ্বিক লজিস্টিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।