চাকরি ও সুবিধায় ভোলবদল: ছড়ায় উঠে আসা সেই চাটুকারিতা

, বাংলাদেশ

চাকরি ও সুবিধায় ভোলবদল: ছড়ায় উঠে আসা সেই চাটুকারিতা

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বৈরাচারের পতনের পরপরই দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটে। সেই সন্ধিক্ষণে সাংবাদিক ও ছড়াকার আবু সালেহ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ‘সুগন্ধা’কে কেন্দ্র করে এক রূঢ় সত্য প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “চাকরি সূত্রে জাতীয়তাবাদী, সুবিধা সূত্রে দলীয়, ভুয়া লোকদের আনাগোনা চলে সুগন্ধায় গিয়ে বলিও।” আজ দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে এসে সেই একই সুবিধাবাদী চক্রের খোলস বদলের মহড়া যেন নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলে যারা রাতারাতি অবস্থান বদলে ফেলেন, তাদের এই চাটুকারিতার ধারা কেবল প্রশাসনেই নয়, বরং পেশাজীবী সমাজ, শিল্প-সাহিত্য অঙ্গন এবং গণমাধ্যমেও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাদের রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পেশাজীবী শ্রেণির বড় একটি অংশের নৈতিক অবক্ষয় এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ। গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নিয়োগ, নিয়োগ-বাণিজ্য, হাসপাতালের শীর্ষ পদ দখল কিংবা প্রকৌশল সংস্থায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে যারা সুবিধা নিয়েছেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই এখন ‘জাতীয়তাবাদী’ পরিচয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এসব পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে এখন আনুগত্য প্রমাণের এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা চলছে। সেমিনার বা সিম্পোজিয়ামে দাঁড়িয়ে তারা দাবি করছেন, আগের সরকারের আমলে তারা ‘বাধ্য হয়ে’ কাজ করেছেন। আবু সালেহর ভাষায়, এরা সেই ‘চাকরি সূত্রে জাতীয়তাবাদী’ শ্রেণি, যাদের কাছে আদর্শের চেয়ে পদোন্নতি কিংবা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট অনেক বেশি মহামূল্যবান। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা আইনজীবীদের একটি বড় অংশের যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে, তা এক অশনিসংকেত। কিন্তু গত এক দশকে এই স্তম্ভটি কীভাবে ক্ষমতার পদলেহন করেছে, তা জাতির জানা।

শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের চিত্র আরও নগ্ন। গত পনেরো বছর যারা বাংলা একাডেমি বা শিল্পকলা একাডেমির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় কার্যালয়ে রূপান্তর করেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় পদক ও প্লটের লোভে সরকারের অন্ধ বন্দনা করেছেন, তাদের অনেকেই আজ ভোল পাল্টে নতুন সরকারের গুণগান গাইছেন। প্রকৃত প্রতিবাদী শিল্পী ও লেখকরা, যারা গত কয়েক বছরে দমন-পীড়ন ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তারা আজ এই সুবিধাভোগী ‘হাইব্রিডদের’ ভিড়ে কোণঠাসা। চাটুকারিতার নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এসব মানুষ এখন টকশোতে এসে গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছেন, যা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে নগ্ন রূপটি চোখে পড়ে শিল্প ও সাহিত্যের অঙ্গনে।

গণমাধ্যমও এই অশুভ চক্র থেকে রেহাই পায়নি। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই মাধ্যমটির একটি অংশ গত এক দশকে স্বৈরাচারের প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছিল। তারা বিরোধী মতের কণ্ঠরোধে মদত দিয়েছে এবং লুণ্ঠনকারীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। অথচ পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘মিডিয়া মোড়লরা’ এখন বাকস্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের জাহির করছেন। নিজেদের অতীত মুছে ফেলতে তারা নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্তুতিতে ব্যস্ত। এরা সাংবাদিকতার নীতি ভূলুণ্ঠিত করছে এবং নতুন সরকারের জন্য এক বিপজ্জনক ফাঁদ তৈরি করছে। সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, টকশোর সঞ্চালক এবং স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ কার্যত পরিণত হয়েছিল স্বৈরাচারের প্রোপাগান্ডা মেশিনে। যারা গতকালও স্বৈরাচারের পক্ষে সম্পাদকীয় লিখেছেন, তারাই আজ পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় ‘গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার’ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

সুবিধাবাদের এই চিরন্তন চক্র ভাঙা ছাড়া টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। সংকটকালে এরা সবার আগে বিশ্বাসঘাতকতা করে। গত দেড় দশকে তৃণমূল কর্মী, স্বাধীন সাংবাদিক ও প্রতিবাদী লেখকরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের প্রাপ্তি যদি এই সুবিধাভোগীদের ঘরে ওঠে, তবে তা হবে গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে বেইমানি। নতুন বাংলাদেশকে গড়তে হলে এসব সুবিধাবাদীদের সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। যদি মেধা, সততা ও আদর্শকে মূল্যায়নের মাপকাঠি করা না হয়, তবে ১৯৯২ সালের সেই ছড়ার সতর্কবার্তা আমাদের ভবিষ্যৎকেও বারবার উপহাস করবে।

আদর্শহীন এসব সুবিধাভোগী ও ভুয়া লোকদের দাপট চিরতরে বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উচ্চমহলে এদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকারকে অনুধাবন করতে হবে যে, চাটুকারদের দিয়ে রাষ্ট্র মেরামত সম্ভব নয়। নতুনভাবে সেই ছড়াকে এভাবে উচ্চারণ করা যায়, “চাকরি সূত্রে জাতীয়তাবাদী, সুবিধা সূত্রে দলীয়, ভুয়া লোকদের আনাগোনা চলে প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলিও।” দীর্ঘ নিবর্তনমূলক দুঃশাসনের পতন ও অভাবনীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি যখন পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে, তখন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়তো বদলেছে, কিন্তু সেই ‘ভুয়া লোকদের আনাগোনা’ বিন্দুমাত্র কমেনি।