বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল ভ্রমণের চিরাচরিত ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পর্যটকরা এখন আর কেবল নামী হোটেল কিংবা বাড়তি জাঁকজমকের পেছনে ছুটছেন না, বরং নিজেদের সময়, ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোকে ভ্রমণের প্রকৃত বিলাসিতা হিসেবে গণ্য করছেন। ভ্রমণকারীদের এই চাহিদার পরিবর্তনের ফলে হোটেল ও রিসোর্টগুলোর সেবাদান পদ্ধতিতেও বড় ধরনের রূপান্তর আসছে। বিলাসভ্রমণকারীদের চাহিদায় যেমন বৈচিত্র্য আসছে, তেমনি তাঁদের এককথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যক্তিগত পছন্দই বিলাসিতার নতুন সংজ্ঞা।
আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের বৈশ্বিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম রাউন্ট্রি বলেন, বিলাসিতা একেক মানুষের কাছে একেক অর্থ বহন করে; এর পরিসর অনেক বিস্তৃত ও গভীর। বর্তমান সময়ে হোটেলগুলো শুধু থাকার জায়গা হিসেবে নয়, বরং ভ্রমণের উদ্দেশ্যের সাথে তাল মিলিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। কেউ হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভ্রমণ করছেন, আবার কেউবা শরীর-মন ভালো রাখতে বা সুস্থতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন। হোটেলগুলোকে এখন এই ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে হোটেলকে যুক্ত হতে হচ্ছে।
ভ্রমণকারীরা এখন এমন অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত ভালো লাগার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্সপ্লোরা জার্নিসের প্রেসিডেন্ট আনা ন্যাশ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ভ্রমণে নিজের সময় ও নিজের মতো করে অভিজ্ঞতা নেওয়ার স্বাধীনতাই প্রকৃত বিলাসিতা। একইভাবে গ্লোবাল হোটেল অ্যালায়েন্সের বিলাসবহুল ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি গোল জানান, পর্যটকরা এখন বাড়তি আয়োজনের চেয়ে নিবিড়ভাবে সময় কাটানো এবং গভীর অনুভূতির অভিজ্ঞতায় বেশি আগ্রহী।
ভ্রমণের ধরন পরিবর্তনের সাথে সাথে হোটেলের কৌশলও পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন অতিথিদের আগেভাগে কক্ষে ঢোকার সুযোগ দেওয়া, দেরিতে কক্ষ ছাড়ার সুবিধা বা বিশেষ কোনো ইভেন্টে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভ্রমণকারীদের সময় বাঁচে, অন্যদিকে ভ্রমণ হয় ঝামেলামুক্ত। তবে এই ব্যক্তিগত পছন্দের সংজ্ঞাটি বেশ জটিল; কারণ একই ব্যক্তি ভ্রমণের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কখনো অত্যন্ত সক্রিয় থাকতে চান, আবার কখনো সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বা একান্তে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। সে কারণে হোটেলের ভূমিকাও বদলে যাচ্ছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিলাসভ্রমণের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন টম রাউন্ট্রি। বিশেষ করে জাপান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ায় পর্যটকদের আগ্রহের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। রাউন্ট্রির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পর্যটকরা সাধারণত প্রথমে টোকিও, কিয়োটো ও ওসাকার মতো পরিচিত শহরগুলো দিয়ে জাপান ভ্রমণ শুরু করেন। কিন্তু একবার পরিচিত হওয়ার পর, তারা ধীরে ধীরে দেশটির অভ্যন্তরীণ অচেনা ও শান্ত অঞ্চলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ও প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া যায়। এই চাহিদা বিবেচনায় আইএইচজি মিয়োকো অঞ্চলে সিক্স সেন্সেস ও কারুইজাওয়ায় রিজেন্ট হোটেল চালুর পরিকল্পনা করেছে।
মালয়েশিয়ার পর্যটন খাতেও একই রকম সম্ভাবনা রয়েছে। রাউন্ট্রির দেওয়া তথ্যমতে, দেশটিতে মোট হোটেল কক্ষের প্রায় ৯ শতাংশ বিলাসবহুল শ্রেণির। সেখানেও ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও রিজেন্ট হোটেলের মতো ব্র্যান্ড নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। অন্যদিকে, নেভিস ট্যুরিজম অথরিটির প্রধান নির্বাহী আন্দিয়া রাভারিয়ের জানান, নেভিসের পর্যটকরা পাহাড়ের চূড়ায় চড়া, প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণে সময় কাটানো কিংবা স্থানীয় রাঁধুনির সাথে খাবার তৈরির মতো বাস্তব অভিজ্ঞতাই বেশি পছন্দ করেন। একে তিনি খালি পায়ে ধীরলয়ে হেঁটে গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভের সাথে তুলনা করেছেন।
পরিবারের সদস্যদের একসাথে ভ্রমণ করার প্রবণতাও এখন আগের তুলনায় বেড়েছে। আইএইচজির রাউন্ট্রি জানান, ২৮ বছর আগে যখন তিনি ইন্টারকন্টিনেন্টালে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, তখন সাধারণ ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে বড়জোর দুই প্রজন্মের দেখা মিলত। কিন্তু এখন সেখানে সাত প্রজন্ম পর্যন্ত একসাথে ভ্রমণে বেরোচ্ছে। ফলে হোটেলগুলোকে এমন ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে, যেখানে পরিবারের সদস্যরা একসাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত পরিসর নিশ্চিত করা যায়। আরও দেখা যাচ্ছে, একসঙ্গে কয়েক প্রজন্মের মানুষ ভ্রমনে বেরোচ্ছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিলাসপণ্যের বৃহত্তর বাজার যখন একভাবে চাপের মুখে, তখন বিলাসভ্রমণের আকর্ষণ ধরে রাখার পেছনে এই বৈচিত্র্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মানুষের সংযোগই বর্তমানে বিলাসবহুল ভ্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন হোটেলে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ‘ইনসাইডার্স এক্সপার্টিজ’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলো পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। পরিশেষে বলা যায়, বিলাসবহুল ভ্রমণের এই নতুন যুগে হোটেলের চাকচিক্যের চেয়ে অতিথির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নিরুপদ্রব সময় এবং নিজস্ব পছন্দে ভ্রমণের স্বাধীনতাই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। যেমন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশা ও প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করা।



