যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন ৪২ বছর বয়সী আবদুল আল-সাইয়েদ।
গতকাল মঙ্গলবারের এই জয়ের মাধ্যমে মার্কিন সিনেটের ২৩৭ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। ১৭৮৯ সালে সিনেটের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো মুসলিম ব্যক্তি এই উচ্চকক্ষে নির্বাচিত হতে পারেননি। আল-সাইয়েদ অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় নিশ্চিত করে এই ধারা ভাঙলেন। ২০২৬ সালের নভেম্বরের এ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আল-সাইয়েদ সেই ধারা ভাঙলেন।
মিশিগানের রচেস্টার হিলসে মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া আল-সাইয়েদ রাজনীতিতে আসার আগে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে নিজের পেশাজীবন গড়ে তোলেন। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি রোডস স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ২০১৪ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, রোডস স্কলারশিপ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম। এরপর রোডস স্কলার হিসেবে ২০১১ সালে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন।
পেশাগত জীবনে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন আল-সাইয়েদ। শহরটির ভয়াবহ আর্থিক সংকটকালে জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেবাবিষয়ক বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রার্থী হলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইয়ে তিনি গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এই কাউন্টির মধ্যেই ডেট্রয়েট শহর অবস্থিত।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে ফের নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসেন আল-সাইয়েদ। গত আগস্টে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে হারিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। তার প্রচারে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং রাশিদা তালিবের মতো প্রভাবশালী প্রগতিশীল রাজনীতিকরা সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় সবার জন্য মেডিকেয়ার কর্মসূচি চালু, আবাসন ব্যয় হ্রাস, শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আল-সাইয়েদ। তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার কঠোর সমালোচনা করায় তিনি বিতর্কের মুখে পড়েন। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানকে তিনি সরাসরি গণহত্যা বলে অভিহিত করেন এবং ইসরায়েলকে দেওয়া নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানান। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
দলীয় বিভক্তির জেরে নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হেইলি স্টিভেন্স নিজ দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন। স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাট শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত আল-সাইয়েদের বিজয় আটকানো যায়নি। দলীয় নেতার সমর্থন হারানোর দিনই আল–সাইয়েদের তহবিলে রেকর্ড অর্থ। স্টিভেন্সের এ সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
নির্বাচনী প্রচারের সময় আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান দলের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দলের শীর্ষ নেতারা তাকে নিশানা করেন। এসব সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় আল-সাইয়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই প্রেসিডেন্ট তার নাম ও ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ইসরায়েল নিয়ে তাঁর অবস্থান নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, মার্কিন সিনেটে আল-সাইয়েদের এই জয় ঐতিহাসিক হলেও কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে মুসলিম প্রতিনিধিরা আগেই দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব এবং ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন।



